উত্তর কলকাতায় ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ তাঁর জন্ম। বাবা কনককুমার রায়, মা গার্গী রায়। বাবার কর্মসূত্রে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল মধ্যপ্রদেশের ধরমজয়গড়ে। ১৯৪২ সাল, ১০ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় আসেন। ভর্তি হন তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি সায়েন্স নিয়ে ইন্টার-মিডিয়েট ক্লাসের পড়া শুরু করেন আশুতোষ কলেজে। সেই সময় দিদি উপহার দিয়েছিলেন একটি কোডাক-ব্রাউনি ক্যামেরা। সেটি পেয়েই এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে মহা উৎসাহে শুরু হল তাঁর ছবি তোলা।
নিউ থিয়েটার্স-এর শুটিং দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে সিনেমায় ক্যামেরাম্যান হবার বাসনা প্রবল করে তোলে। সেই সময় রক্ষণশীল যৌথ পারিবারিক মূল্যবোধে সিনেমা করিয়ে হবার পথ আজকের মত এত সহজ ছিল না। তবুও ছেলে বায়না করলো মায়ের কাছে। মা সহায়ক হয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নপূরণে। মায়ের অনুরোধে এক আত্মীয় পরিচয় করিয়ে দেন বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী রামানন্দ সেনগুপ্তের সঙ্গে। তারপর একে একে জি. কে. মেহেতা, দেওজিভাই, অজয় কর, অনিল গুপ্ত, বিমল মুখোপাধ্যায়, দীনেন গুপ্ত এবং রিয়েলিস্টিক ও বাউন্স লাইটিংয়ের পথিকৃত সুব্রত মিত্র। নানা আলোছায়ার কল্পনা ক্রমে ক্রমে বাস্তবায়িত হয় প্রকৃতির পাঠশালায়।

১৯৬০ সাল, ডাক পড়লো সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রের চিত্রগ্রহণে। একই সঙ্গে তাঁরই পরিচালিত কাহিনিচিত্র ‘তিনকন্যা’য়। এবার স্বাধীন আলোকচিত্রীর ভূমিকায়। বাকিটা উজ্জ্বল ইতিহাস। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও তিনি কাজ করেছেন তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, রাজা সেন প্রমুখ চিত্রপরিচালকদের সঙ্গে। কাহিনিচিত্র, তথ্যচিত্র, টেলিফিল্ম, টিভি-ধারাবাহিক, পুতুলচিত্র তাঁর আলোকচিত্রে সমৃদ্ধ হয়েছে। অশনি সংকেত, সোনার কেল্লা, শতরঞ্জ কে খিলাড়ী, এবং সুচিত্রা মিত্র(তথ্যচিত্র)-এর জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ছাড়াও অন্যান্য বহু পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন।

শুরুর দিন থেকেই জীবনস্মৃতি আর্কাইভ-এর অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক ছিলেন এই মানুষটি। তিনি আমাদের ‘রায়স্যার’। আলোকচিত্রশিল্পী সৌম্যেন্দু রায়। ‘সৌম্যেন্দু-সিন্দুক’ শিরোনামে তাঁর জীবন ও সৃজন নিয়ে জীবনস্মৃতি-এর ঘরে একটি বিভাগের কাজ শুরু হয়েছে গত তিন বছর ধরে। জীবনস্মৃতি গত ১৮ বছর ধরে তাঁর জন্মদিন পালন করে চলেছে নানা উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। বর্তমান বছরে ‘রায়স্যার’-এর ৯৩তম জন্মবর্ষে তাঁকে স্মরণ এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়েছিল একটি প্রদর্শনী, মন্ত্রপাঠ, সংগীত, নিবন্ধপাঠ ও আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে।
প্রদর্শনীতে ছিল এক)দিদির কাছ থেকে উপহার পাওয়া কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় তোলা প্রথম জীবনের স্থিরচিত্রের মূল প্রিন্ট।
দুই) শুটিংয়ের খসড়া খাতা। তিন) ব্যবহৃত বই, ক্যামেরা ও ফিল্টার।

প্রদর্শনীর উদ্যোগ, ভাবনা ও রূপায়ণে জীবনস্মৃতি আর্কাইভ –এর প্রাণপুরুষ অরিন্দম সাহা সরদার। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ।
জীবনস্মৃতি-র প্রদর্শকক্ষে ৭ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, প্রতিদিন দুপুর ১২ থেকে ৩টে পর্যন্ত প্রদর্শনীটি চলেছিল।